দুগগা পুজো আসছে। বাঙ্গালীর সর্ববৃহৎ মোচ্ছব।
আর যত এগুচ্ছে তত ভয় কচ্ছে। সত্যি বলতে সেই এক পুরানো বডি কে নতুন নতুন জামা জুতো
পরিয়ে সপ্তমী টু নবমী ভাসিয়ে দাও পার্বনের চড়া স্রোতে... কি বিপদ। যেহেতু
ছেলেবেলায় রচনায় লিখেছ এটাই বাঙ্গালীর সেরা পার্বন অতএব রাগ অভিমান পকেটে গুজে
বেরিয়ে পড়। উঁচু দাঁত কে ঠোঁট দিয়ে চেপে রাখার মতন মনে জমে থাকা ছিঁচকে ব্যার্থতাবোধ
কে ঢেকে রাখতে হবে এ সময়। সমাজের অলিখিত ফরমান। তুমি যতই চাওনা কেন, পাবলিক-ই তোমার
নিতম্বে একটা আদুরে টোনা মেরে জপাৎ করে ফেলবে আনন্দেরই অমৃতপুলে। অতএব সহজ কথায় বগলে
সুগন্ধি স্প্রে করে বেরিয়ে পর বজ্জাত জুতোর ভিড়ে।
উফফ কি সাঙ্ঘাতিক। ভীষণ ল্যাদারু আমি, অনেকটা
নর্দমার পাশে পরে থাকা ভেজা প্লাস্টিকের মত খাটে পরে থাকি পুজোর সকাল গুলোয়। আর রাতে
বেরতেই ধাক্কা! এত পাবলিক ছিলো কোথায় ? কাতারে কাতারে লোক উৎসবের জোয়ারে ড্রাইভ
মারছে, পা মাড়াচ্ছে, থুতু ফেলছে, পায়ে দামড়া ফোসকা নিয়ে খোঁড়াচ্ছে আর একের পর এক
প্যান্ডেলের লাইনে দাড়িয়ে পরছে। ফুচকার দোকানে রেশনের মতো লাইন। হাউহাউ করে ফুচকা
খাচ্ছে সব। বাচ্চা গুলোর ভেপু আর ফটাস ফটাস ক্যাপ ফাটানোর শব্দে প্রান ওষ্ঠাগত।
বন্ধু দের কানে ব্যাপারটা তুলতেই বাছা বাছা ২-৪ অক্ষর ধেয়ে এল। তুমি কে হে
হরিদাসের নাতি? নেগেটিভ চশমায় দুনিয়া মাপিছ। আরে বেরিয়েছ যখন আনন্দ টা চেটেপুটে খাও।
বলতে বলতে প্যান্ডেলের লাইনে দাঁড়ানো গেল। পিছনে পাল পাল লোক। সামনের লোকের ঘামের
গন্ধ শুকতে শুকতে এগিয়ে চললুম। মাঝে মাঝে পাঁজরায় সহযাত্রীর কনুই এর গুতো আর সুপারসহিস্নু
নিতম্ব বাঁশের রেলিং এ ঠেকিয়ে বসে থাকা। হটাত বাঁশের ধার ঘেঁষে, নারিকেল দড়ির তলা
বেয়ে, পিছনের লোকের দাঁত খিঁচুনি শুনতে শুনতে এগিয়ে চললুম। পুজোর লাইনে দাড়িয়েছ কি
মরেছো। প্রেম আর পুজোর লাইন অনেকটা সিপিয়েমের মতন। একবার ঢুকলে মাথা না নুড়িয়ে
বেরতে পারবেন না। বলতে বলতে পিছনের লোক আর পঞ্চাশ পা এগিয়ে দিলে। উফ দিব্বি ছিলুম
কোলবালিশ ঠেসে শুয়ে। পাটু খুলে গেল হাটতে হাটতে। নিতম্বের ভার আর নেওয়া যাচ্ছে না।
এবার একটু দুর্গার কোলে বসে রেস্ট নেব ভাবছি। হটাত দেখি বিশাল একটা আখের ছিবড়ের
স্তুপ। ওটাই নাকি প্যান্ডেল। অদিকে বোঝার আগেই আমার দুই কাঁধ, মাথা, বগোল এমনকি
দুই পায়ের ফাঁক দিয়েও লোকে ক্যামেরা গুজে দিয়েছে ফটো তুলবে বলে। আচমকাই ক্যামেরা
স্টান্ড হয়ে রইলুম।
রাস্তায় পিলপিল করছে লোক। কোথাও আবার মেলাও
বসেছে। ন্যাপি পরা বাচ্চা বেলুন বেলুন করে হাপুস নয়নে কেদে ভাসাচ্ছে। চ্যাংরা ছেলের
বেলুনে তাক করা বন্দুক মারতেই ভিড় থেকে বাঘের বাচ্চা উপাধি প্রাপ্তি। প্রবল
গনতান্ত্রিক ভাতৃত্ববোধে অচেনা লোকের জামায় মুছে দিচ্ছে রোলের সস। ভিড়ে নড়ার যায়গা
নেই। প্যান্ডেল গুলোতে তো আবার থিমের হাওয়া লেগেছে। যে যা হাতের নাগালে পাচ্ছে
প্যান্ডেলে নতুন ভাবনা বলে জুড়ে দিচ্ছে। ঘাসের প্যান্ডেল হলে গরুদের জন্যে ১৪৪
ধারা জারি। আখের ছিবরে, গাজার কল্কে, লেড়ি বিস্কুট থেকে সিমেণ্টের দুগগা। ইয়া বড়
বড় ঢাউস ঢাউস চোখ, থেবরা নাক অনেকটা যামিনী রায়ের ১৩৩ গুন বড় ফটোকপি।
অদিকে ফচকে ছেলেদের তো অলিম্পিক... তিন দিনে
তেত্রিশো মেয়ে দর্শন আর সুযোগ পেলেই “আড্যাম টিজিং”। বাগবাজারের চম্পা থেকে
সল্টলেকের ঝিঙ্কু মামনি। দিল টু দিলের কথপকথন। “এ কি যুগ দিলে মা? ... শেষমেষ দিল
নিয়ে দ্বিলেমা!” সঙ্গে কিছু সস্তা খেউর। এসব দেখতে দেখতে, কোনোমতে আলগোছে ঠাকুর কে
পেন্নাম ঠুকে শেষে প্যান্ডেল থেকে বেরোলুম। হাটতে হাটতে মালাইচাকি ঢোল। বিশাল সব
স্টল সামনে। পেটের ধাতানিতে এগরোলের স্টলের দিকে গেলুম। চিবুতে চিবুতে সামনে এগোলাম।
স্টেজে ফাংশান হচ্চে। দামড়া মেয়েরা বেবি ডল নাচতে গিয়ে অনেকের হৃদয় মালটিকালার করে
দিচ্ছে। এর মধ্যে কার আবার পকেট মেরে দিয়েছে। এত পকেটমারদের-ই সিজেন মশাই। ডাকাতের
যেমন কালী তেমনই এদের দুর্গা। লিগ তমাগো তো শিল্ড আমাগো। আর দুপা গেলুম। টুনীর আলো
গুলো ফিকে হয়ে আসছে। রাত অনেক হল। এবারে বাড়ি গেলাম। টাটা।