বেশ কয়েক বছর ধরে খুব ছেলেবেলা কে মিস করছি। কাল
ছেলেবেলার বন্ধু দের সাথে একসাথে আড্ডা মারার পর থেকে তো সেটা আবার চাগার দিল। তখন
আমাদের বাড়িতে টিভি ছিল না। অমন একটা বাক্সে যে আমার মতো লোক দেখতে পাওয়া যায় তা
তো কল্পনার অতীত। পাড়াতে পার্থ দার বাড়িতে টিভি ছিল। দল বেঁধে সেখানে যেতুম। শচীন
চার ছয় মারলে তো উল্লাসে পারাময়। আউট হোলে ভাই চ্যা ভ্যা করে কেদে ফেলত। বুলু
কাকার আবার অপার সন্দেহ। নিশ্চয় গটআপ। এরপর বাড়িতে একদিন টিভি এল। দুপুরবেলা ঢুলু
ঢুলু চোখে ২০ টা গড়ের অঙ্ক করলে তবে শনিবারের বিকালে সিনেমা দেখার অনুমতি পেতুম। আমার
পিসি আবার খুব ইমশনাল। সন্ধ্যা রায়ের চোখের এক ফোঁটা জল কে কুড়ি দিয়ে মালটিপ্লাই
করে পিসি চোখের জল ফেলত। সে কি কান্না।
পাড়ার-ই এক স্কুলে পরতুম। স্কুলে যাওয়ার পথে পদ কাকার
দোকানের জোকার বিস্কুট আর বাপুজি কেক ছিল আমার ফেভারিট। অঙ্ক পারলে পরের দিন জোকার
বিস্কুট জুটত। প্রত্যেক রবিবার সকালে শক্তিমান আর রাতে বাংলা সিনেমার গান হত। “এ
আমার গুরুদক্ষিনা” বাজলে তো কথাই নেই। আমার ফেভারিট গান। প্রতিবার দোলের সময় কুকুর
বিড়াল আর গরু কে রঙ মাখতাম। একবার সাহস করে পাড়ার এক দাদু কে রঙ মাখাতে গিয়ে কি
চিত্তির। উল্টে আমাকে ধরেই এক থাবা বাদুরে রঙ চুলের ভিতে ঢেলে দিল। মানুষের প্রতি
বিশ্বাস সেদিন থেকেই নেই। পাজামার দড়ি ধরে অভিশাপ দিলাম। যদিও সেটা ফলে নি।
কায়স্থের অভিশাপ বলেই বোধ হয়। তবে রবিবার পাড়ার মাঠে শক্ত ডিউস কর্কেটে খেলা হত। মাঠের
ধারে দাড়িয়ে খেলায় লোক কম হওয়ার শাপ দিতাম। এটা মোটামুটি ফলে গেলে তবেই খেলার
সুযোগ মিলত। ব্যাটিং করার একদিন সুযোগ পেয়েছিলাম। কর্কেট বল যে এত শক্ত তা কে
জানত!
স্কুলে আমাদের সাথে শঙ্কর পড়ত। ব্রাহ্মন সন্তান। কিছু বললেই
দু-আঙ্গুলে পৈতে পেঁচিয়ে শাপ দিতো। সেদিন একপাতা সচিনের জলছবি কিনে সবে মাত্র
ব্যাগে রেখেছি। ব্যাটা এসে বলে ব্যাগে কি রেখেছিস বের কর। জোর করে কেড়ে নিয়ে পেনের
পিছন ঘসে আমার চোখের সামনে জলছবি গুলো নিজের খাতায় সেটে দিল মাইরি। মনের কষ্ট গুলো
চোঁয়া ঢেঁকুরের মতো চোখের কনে জমতে লাগল। আরেকদিন পঞ্চাশ পয়সায় কেনা দাঁতের লড়াই
বেমালুম ঝেপে দিল। তখন খিস্তি জানতুম না। মনের রাগ মেটাতে হলে রাস্তায় পরে থাকা
খালি বোতলে কনসেন্সট্রেট করতাম। সপাটে এক লাথি। বিরাটির রাস্তার পাসে খালে টুপুত
করে জলে। নিজেকে পেলে মনে হত। অফ পিরিয়ডে পেনের লড়াই খেলতাম। মোটা থ্যাবড়া বদখদ
কালির একটা পেন ছিল। টিপ করে মারলে সেটা খোলা টেবিলের মাথায় এক বুক চিতিয়ে দাড়িয়ে
থাকত।
রাতে খুব কারেন্ট যেতো। কারেন্ট গেলেই পড়াশুনা লাটে তুলে
মোমবাতির আলোয় হরিন বানাতাম। সুযোগ পেলে মাঠে মাদুর পেতে চাদের আলোয় হৈচৈ। তখন সম্পদ
বলতে সাদা পেন্সিল বক্সের টুকটুকে কমলা বা লাল কালারের সেন্টেড রবার। কি তার
মহিমা। ছোটো কাকা কিনে দিয়েছিল। রোজ ঘুমোতে যাবার আগে নাকের ডগায় রেখে শুতাম। কি
মিস্টি একটা গন্ধ। গলার কাছ টা কেমন যেন বুজে আসছে। প্রতিবার লিখতে গেলেই গলা টা
অমন করে। যাজ্ঞে !
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন