বুধবার, ১ মার্চ, ২০১৭

ও “ম্যা(ওকৎ)-মিক”

যাক বাবা অবশেষে তিনি বেরোলেন। কে আবার, সু-আত্মীয় এবং কু—আত্মীয় চেনার ফিল্টার- শ্রীমান মাধ্যমিক। বঙ্গে রাতারাতি শিক্ষ্যা সচেতন পাবলিকে ছয়লাপ। অন্য সময় যে মা মাসিরা ঝিলিকের মা কে নিয়ে কনসার্ন থাকত তিনিও আজ ইংলিশ কোয়েসচেন টা কি কঠিন ছিল বলে তারস্বরে চেঁচাচ্ছেন। এই একটি মাত্র রেজাল্ট যাহাতে বাঙ্গালীর ব্রেনে শিক্ষ্যার মিনি কালবৈশাখী। ফলাফল? দেশের অগুনতি জানা অজানা কচিকাঁচার ভবিশ্যত জানার জন্যে তাদের বুক ফেটে যাবে। উরিবাবা রে , সে কি টেনশন। নাকের জলে চোখের জলের সাথে ঘামের নোনতা জল মিশে যাচ্চেতাই অবস্থা। বাবা মা টানতে টানতে সাইবার কাফে টে লাইন লাগিয়েছেন। লাইনে দাঁড়ানো সামনের ছেলের ভাল রেজাল্ট হল কি হলনা টেনশন ইজ মাল্টিপ্লায়েড বাই টু। বাবু ইস-স্টার পাবি তো! সোনা, অঙ্কে লেটার হবে তো?  বাড়ি থেকে বেরোতে পারলুম কি পারলুম নে, পাশের বাড়ির দিদিমার সন্দিগ্ধ চাহুনি, “কি দাদুভাই? ফার্স্ট ডিভিশন হবে তো।“ সদ্য বিবাহিত নতুন বৌদিও সুধাচ্ছে, “হ্যাঁগো, কয়টা লেটার পাবে ঠাকুরপো?” ভোটের প্রাক্কালে বোর্ডের কি করুন মেলড্রামা! আমার স্কুলে এক বন্ধু ছিল। দিব্যি পড়াশুনা মার্কা সুরত। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। গায়ে বইএর গন্ধ। দেখলেই বোঝা যেতো সরস্বতী ব্রেনে গুছিয়ে লাইব্রেরী বানিয়েছে। আমাদের কয়েকজন কে সে তো ক্রীতদাসের নজরে দেখত। রেজাল্টের দিন আমি তো খাটে লগবগে সাপের মত শুয়ে আছি। বালিশে মুখ ঢুকিয়ে। লোকনাথ বাবার মন্ত্র আওড়াচ্ছি। বাড়িতে পেয়ারা গাছের ডাল, বেতের ডাণ্ডা অবশ্য আগের রাতেই হাপিস করেছি। এমন সময় এক বন্ধুর ফোন- “কিরে বাড়িতে বোরখা রেডি তো? ফেল করলে তো লুকতে হবে?” যতসব বোকার দল! তখনও চার অক্ষর সম্পরকে জ্ঞ্যান হয়নি-সত্যি।  এমন সময় খবর এল সেই প্রতিভাময়, জেন্টস স্বরস্বতী, গেইলের মত স্কোর করেছেন। টেনসনে মুখের ভেতর থর মরুভুমি। ভগবান কে মানতে ভরিয়ে দিচ্ছি মনে মনে। শুনলাম টিভি চ্যানেল থেকেও ডাক এসেছে।  ক্যামেরার সামনে ওর পাশের বাড়ির কাকিমা তো গাল ধরে বুবলি বুবলি বুশ- “জানেন ছেলে বেলায় আমার কোলে কত হিসু করত? সেই শাড়ি এখন যতনে তুলে রেখেছি।” আমি তো অবাক! ছেলেবেলায় কি করে বুঝল মাধ্যমিকে স্টার পাবে। আমরা টা তো সারাজীবন ড্রেনেই... যাকগে সে সব অপমানসূচক দিন!
তারপর পাড়ার মা বোনেরা তো মিস্টি খাওয়ানোর জন্য হুরোহুরি। টিভি আঙ্করদের সন্দিগ্ধ প্রশ্ন- কত ঘন্টা পরতে? কতবার ঢোক গিলতে?
আমার এসব দেখতে দেখতে চোয়া ঢেকুর উঠে গেল। স্কুলে গেলুম। প্রবল জন(থুরি) ছাত্র সমুদ্রে হ্যাচড়প্যাঁচড় করে গলে বাজখাই গলায় নিজের বদনাম খুজতে শুরু করলাম। আঙ্গুলে গিট মেরে নিজের কপাল খুজছি লিস্টে। আমার দেড় কাটা কপালেও সুখ সয় তালে।
সাইবার ক্যাফে গুলোর তো এসময় মোচ্ছব। ভাল রেজাল্টএ ২৫ টাকা, ফার্স্ট ডিভিশন পেলে ১৫ টাকা আর ফেল করলে ফ্রী। যদিও সেটা আর মর্মান্তিক। ক্যাফের সমস্ত লোকের সামনে মান সম্মানের একশ পুর্তি। সীতার মত পুন্যি আমাগো স্টকে নেই যে ধরণী স্ক্রেচ হবে।
মেয়েদের তাও একটা দিক খোলা থাকত। খারাপ রেজাল্টের সাথে সাথে ক্রন্দনরত মুখে আশু বিবাহের সূচনা। আমাগো তো তাও নেই। খোটা সর্বস্ব গৃহে, ল্যান্ড লাইনের তারস্বরে চেঁচানিও অসহ্য লাগতএই একটা দিনে ফ্যামিলির যত অবাঞ্ছিত অভ্যাগতের ফোনালাপ শুরু হত। “হ্যাঁ গো, তোমাদের খবর কি? অমুক ভাল আছে? ডট ডট ডট আমাদের বাবুর খবর কি?” কানের গোঁড়ায় লাদেন ফলক...অসহ্য।
তারপর আনন্দবাজার তো আছেই। কলকাতা কে টেক্কা দিল জেলা। কি অদ্ভুত? তাতে কার কি এসে গেল? বাঙ্গালীর আদিক্ষ্যেতা তো শুরু হবে এরপর। পেপার গিলে এসে দুঃস্থ ছাত্রের কানের গোঁড়ায় ঢালবে, অমুক ছেলে এত ঘন্টা পরত,  তমুকের ছেলে হিসু করতে গেলে বই বগলে থাকত।
এই অপরকে দেখে নিজেকে চালনা করার মধ্যেই বাঙালী খুঁজে পায় তার গার্জিয়ান সত্তা। এরপর যতদিন না একটা দেখনদারি মার্কা কিছু হচ্ছে, ততদিন এই সত্তার বাস্তাবায়ন নিশ্চিত। এতে পছন্দমত ছাত্র অথা ছাত্রী টিকে তেরে অপমান করার সাথে পাওয়া যায় এক নিটোল আনন্দ
তবে এতসবের মধ্যেও পজিটিভিটি বিদ্যমান। মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রাক্কালে, সমগ্র পাড়াতুতো বাঙ্গালীর  রুগ্ন পাঁজরের তলে, ধুকপুকানি স্টার্ট। ঠিক মাহেন্দ্রক্ষণে ব্যালকনির ডগায় সমগ্র পাড়া হাজির। সচিন অথবা নেহেরা ক্রিজে নামিছে যে। পেন নিয়েছিস ঠিক মত? মা বাবাকে প্রনাম? পোষা ডগিকে আদর সবই চাই। অবশেষে রেজাল্ট বেরুলে “কি মাসিমা, খবর কী?” 
হ্যাঁ ওই হল আর কি। হায়ার থার্ড ডিভিশন।
(ওই বাঙ্গালীর ভাষা প্রতিভা। এক ডিভিশনের তিনটি ভাগ খুলে বসেছে।)
যাক সবাই পাশ করেছে তো?

তবে যাই হোক, দিনান্তে বাঙ্গালীকে কেচ্ছাপ্রবন বলে গালি মারবেন না দাদা। এই একটা দিনই তো প্রতিবছর আসে, যেদিন মনে ভেসে ওঠে সুশিক্ষ্যার গ্যাঁজলা। বরং এই শিক্ষ্যার সাগরে আপনি নিজেকে ভাসিয়ে দিন। সন্দিগ্ধ নজর রাখুন কেলাস নাইনের পোলাপান গুলার দিকে। সামনের বছর এরাই তো রসদ জোগাবে।

কোন মন্তব্য নেই: